৪০০ বছরের বেশি পুরনো ও ঐতিহ্যবাহী কুলেশ্বরী কালী বাড়ির পুজো, আজও পুরনো রীতি মেনে পুজিতা হন মাকালী

0
Advertisement

সুজয় মন্ডল, হাসনাবাদ :- ৪০০ বছরের বেশি পুরনো ও ঐতিহ্যশালী কুলেশ্বরী কালীর আরাধনা হয়ে আসছে আজও সেই জমিদারী আমলের পুরনো রীতি মেনেই। কথিত আছে এই কুলেশ্বরী কালী মন্দির প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বাংলার বার ভূঁইয়াদের অন্যতম যশোরের ভূঁইয়াধিপতি প্রতাপাদিত্যের সময়ে যার সাথে আকবরের সেনাপতি মানসিংহের একবার যুদ্ধ ও হয়েছিলো। তবে কুলেশ্বরী কালী মন্দির প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল রায়চৌধুরী পরিবারের হাতেই। সে সময় রায় চৌধুরী বাড়ি মায়ের স্বপ্নাদেশ পেয়েই পূজা করেন হাসনাবাদের রোজিপুরের কালী তলায়। কালিতলা থেকে বিসর্জন দেওয়া ঘট কূলে ভেসে আসায় সেই ঘটে এই কূলেশ্বরী কালীবাড়ি প্রতিষ্ঠিত হয় এবং সেই থেকে এই নদীর নামকরণ ও হয় কূলেশ্বরী নদী। প্রথমে ছোট করে খড় ও গোলপাতার চাল এবং মাটির দেওয়াল দিয়ে মন্দির প্রতিষ্ঠা হওয়ার পর ধীরে ধীরে তা সংস্কার করা হয় ।

বাংলার যশোহরের বার ভূঁইয়াধিপতি প্রতাপাদিত্য বরেন্দ্রভূমির ব্রাহ্মণ ‘মৈত্র’ উপাধি প্রাপ্ত অনন্ত চক্রবর্তী কে টাকির কূলে নিয়ে আসেন পূজার্চনা ও দেব সেবার জন্য। টাকি কুলের মৈত্ররা ছিলেন সেসময় সমাজ চক্রের অগ্রণী। তাই চক্রবর্তী বলেই খ্যাত ছিলেন তারা। বাংলা ৪৭০সালে ইংরেজি ১০৬৩ সালে কান্যকুব্জ থেকে দুর্ভাগ্যক্রমে কাতর হয়ে একশ ঘর মল্লিক ব্রাহ্মণ বরেন্দ্র ভূমিতে চলে আসেন ,তারাই বারেন্দ্র ব্রাহ্মণ বলে খ্যাত। নির্দিষ্ট করে কূলের আদি কোন সাল না থাকায় এর প্রতিষ্ঠাকাল সম্পর্কে অনেক মতবিরোধ আছে ।তবে রাজা প্রতাপাদিত্যের সময় ব্রাহ্মণ অনন্ত চক্রবর্তী থেকে আজ পর্যন্ত প্রায় চৌদ্দ পুরুষ ধরে এই পূজার্চনা চলছে। বর্তমানে এই মন্দিরের পূজার্চনার দায়িত্বে রয়েছেন স্বামী সর্বানন্দগিরি মহারাজ জি ও তার শিষ্য স্বামী সত্যানন্দ তীর্থনাথ জি। এই মন্দির কে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে টাকি’ মা কুলেশ্বরী সেবাশ্রম সংঘ’, ও ত্রিশক্তি মন্দির,যেখানে অধিষ্ঠিতা আছেন মা বগলা, মা চন্ডীকা, এবং মা তারা। এই কুলেশ্বরী কালী মায়ের চারটি হাত রুপোর তৈরি। এই মাকে ঘিরেই সারা বছর ধরে চলতে থাকে পূজার্চনা ও নানান অনুষ্ঠান। প্রতিদিন মায়ের তিনবার পূজার্চনা হয়। সকালে মঙ্গলারতি ,দুপুরে মধ্যাহ্ন ভোগ এবং সন্ধ্যায় সন্ধ্যারতি। এছাড়া বিশেষ দিনে বিশেষ পূজা হয় সারা বছর ধরে। যেমন জ্যৈষ্ঠ মাসে ফলাহারী পূজা, চৈত্রে গাজন উৎসব ,ধুনুচি নাচ ও নীল উৎসব ইত্যাদি। মূল কালীপূজার আগে আদি কালীবাড়িতে বিশেষ পূজার পর এখানে পূজা শুরু হয়।অমাবস্যা শুরু হওয়ার পর এবং শেষ হওয়ার আগে এখানে কালীপূজা সম্পূর্ণ করা হয়। পূজার দিনে মাকে নানান রকম গহনাও ফুল দিয়ে সাজানো হয়।টাকি সংলগ্ন এলাকাসহ বহু দূরদূরান্ত থেকে অনিকস মানুষ জন এখানে আসেন মায়ের পুজো দিতে এবং পূজার্চনায় অংশগ্রহণ করতে। বহু লোকের সমাগমে টাকি এই কুলেশ্বরী কালী মন্দির ভরপুর হয়ে ওঠে। পার্শ্ববর্তী থানা হাসনাবাদ থেকে প্রচুর পুলিশ এখানে মোতায়েন করতে হয় ভিড় সামাল দিতে। এই পূজায় পাঠা বলি ও কুমড়ো বলির প্রচলন রয়েছে আজও। কয়েক বছর আগেও পাঠা বলির সংখ্যা শতাধিক থাকলেও বর্তমানে তা অনেকখানি কমেছে। বলির জন্য কামার বাড়ি থেকে তিনজনকে আনা হয়। পরের দিন মায়ের ভোগ চড়ানোর জন্য রান্না হয় খিচুড়ি, পক্কান্ন, পোলাও ভাত। এছাড়াও এই পূজায় আমিষ ভোগের ও ব্যবস্থা থাকে। মায়ের ভক্তদের পরিবেশনের জন্য থাকে মায়ের ভোগ সহ মাছের ঝোল, মাংসের ঝোল এবং বিভিন্ন রকমারি পদ। ঐতিহ্যশালী এই কালী মন্দিরে প্রশাসনিক দায়িত্বে থাকা স্বামী সত্যানন্দ তীর্থনাথজী জানান যে ,এই মন্দিরের কালীপূজায় পূর্বে কামান দাগা হতো। যদিও বর্তমানে আর তা হয় না। চারশত বছরের বেশি পুরনো ঐতিহ্যশালী এই মন্দিরের ভগ্নদশা সংস্কারের জন্য তিনি মন্দির কর্তৃপক্ষের তরফ থেকে সরকারি দপ্তরে সাহায্যের জন্য আবেদন জানিয়েছেন এবং পাশাপাশি সরকারি তরফ থেকেও তাকে আশ্বস্ত করা হয়েছে সাহায্যের ব্যাপারে। খুব শিঘ্রই সেই সাহায্য মিলবে বলেও তিনি আশাবাদী।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

6 − three =