সন্দেশখালিতে মৃত ভিলেজ পুলিশের সৎকার হচ্ছে নিজের বাড়ি ঢোল খালিতে, অভিযুক্তদের ফাঁসির দাবি জানিয়েছেন মৃতের বাবা

0

সুজয় মন্ডল, বসিরহাট :- সন্দেশখালি থানার সন্দেশখালি পঞ্চায়েতের বউ ঠাকুরান এলাকায় দুষ্কৃতীদের তাণ্ডব রুখতে অকালে প্রাণ হারালেন বিশ্বজিৎ মাইতি। এই ঘটনায় সমগ্র এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। সন্দেশখালি মৃত ভিলেজ পুলিশের মৃতদেহ আসে ঢোল খালি গ্রামে। মৃতের বাবা গৌরপদ মাইতি রাজ্য সরকারের কাছে একটি চাকরির আবেদন জানিয়েছেন তার ছোট ছেলে অভিজিৎ মাইতি জন্য। পাশাপাশি অভিযুক্তদের ফাঁসির দাবি জানিয়েছেন মৃতের বাবা। আর যেসব বাকি দুষ্কৃতীরা আছে তাদের অবিলম্বে গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
সন্দেশখালি মৃত ভিলেজ পুলিশের সৎকার হচ্ছে নিজের বাড়ি ঢোল খালিতে। বাড়িতেই দাহ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিশ্বজিৎ এর পরিবার।

পেশায় রিক্সাচালক গৌর মাইতি ও প্রতিমা মাইতির দুই সন্তানের মধ্যে বিশ্বজিৎ মাইতি ছিল পরিবারের একমাত্র আশাভরসা। তাদের দ্বিতীয় সন্তান তামিলনাড়ুতে কাজ করে। বাবা গৌর মাইতি রিকশা চালিয়ে কোনরকমে বিশ্বজিৎ মাইতি কে লেখাপড়া শিখিয়ে ছিলেন। আর্থিক দুর্বলতার কারণে অপর সন্তান তামিলনাড়ুতে চলে যায় কাজের সন্ধানে। হতদরিদ্র পরিবারের একদিন বিশ্বজিৎ মাইতি ভিলেজ পুলিশের চাকরি পেয়ে সংসারের হাল ধরেন এবং বাবা-মায়ের দুঃখ-দুর্দশা মোচন করার চেষ্টা করেন। কিন্তু সে সুখের সংসার বেশি দিন স্থায়ী হল না। সে স্থানীয় এলাকার দুষ্কৃতীদের পথের কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছিলো। তাই অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতে গিয়ে লড়াইয়ের ময়দানে দুষ্কৃতীদের গুলিতে অকালে প্রাণ বিসর্জন দিতে হলো তাকে। স্থানীয় গ্রামবাসীদের থেকে জানা যায়, স্থানীয় এলাকায় কেদার সরদার, লালটু সর্দার সহ বেশ কিছু দুষ্কৃতী সময়ে-অসময়ে গ্রামবাসীদের উপর অত্যাচার করে। শিশু থেকে নারী পুরুষ আবালবৃদ্ধবনিতা কেউই ছাড় পায় না তাদের হাত থেকে।তাদের অসামাজিক কাজকর্ম যারা মেনে নিতে পারে না, প্রতিবাদ করে ,তাদেরকে আক্রমণের শিকার হতে হয়। এমনকি মহিলাদের নানা রকম শারীরিক মানসিক নির্যাতন করার পরও তাদের ওপর থাকত নানারকম শাসানী ও হুমকি। নানান রকম অপকর্ম এমনকি মহিলাদের সিঁথিতে সিঁদুর পর্যন্ত তুলে দিতো কাউকে কোনো পরোয়া না করেই। গ্রামের মানুষ যেই প্রতিবাদ করতে যেতো, তাকে ও তার পরিবারকে আক্রোশের শিকার হতে হতো। সব মিলে বিগত বেশ কয়েক বছর খুলনা শীতলিয়া অঞ্চল ও বউ-ঠাকুরানী এলাকা র সাধারণ মানুষ তাদের মুখের উপর কথা বলতে পারতো না প্রানের ভয়ে। সন্দেশখালি পঞ্চায়েতের বউ ঠাকুরান এলাকায় শ্যামা কালী পূজার বিসর্জন উপলক্ষে মেলার আয়োজন হয়। হঠাৎ সেখানে গোলমাল হতেই কুখ্যাত দুষ্কৃতী কেদার সরদারের নেতৃত্বে এক ব্যক্তিকে মারধর করে তার পেটে বোতল ভেঙে কাঁচ ঢুকিয়ে দিলে খবর পেয়ে ভিলেজ পুলিশ বিশ্বজিৎ মাইতি ও সন্দেশখালি থানার ওসি অরিন্দম হালদারের তৎপরতায় আসামি ধরতে পুলিশ গ্রামে ঢুকতেই কেদার বাহিনী গুলি চালালে বিশ্বজিৎ মাইতি গুলিবিদ্ধ হনএবং ওসি সহ বেশ কিছু পুলিশ কর্মী আহত হন। পরে স্থানীয় গ্রামবাসীদের তৎপরতায় প্রথমে খুলনা হসপিটাল ও পরে কলকাতায় নিয়ে সকলকে চিকিৎসার ব্যবস্থা হলেও হসপিটালে মারা যান বিশ্বজিৎ মাইতি। প্রতিমা মাইতি হতদরিদ্র পরিবারে বহু দুঃখ কষ্টের মধ্যে দিয়ে মানুষ করেছিলেন তার দুই সন্তানকে। দুই সন্তান ছিল তার নয়নের মনির মতো। তবে কর্মসূত্রে বিশ্বজিৎ বেশিরভাগ মায়ের কাছাকাছি ছিলো। বিশ্বজিৎকে হারিয়ে মা আজ মনিহারা ফণির মতো অবস্থা। সন্তান হারানোর বেদনায় আজ প্রতিমা মাইতি শোকাহত। মা প্রতিমা মাইতি বলেন, আমার সন্তান তো কোন অন্যায় করেনি। তবে কেন আজ অকালে তাকে চলে যেতে হলো। যেখানেই থাকুক না কেন ও এসে আমাকে বলতো, মা আমায় ভাত দাও খুব ক্ষিধে পেয়েছে। মা আমায় একটু জল দাও, পিপাসা পেয়েছে। আজ আমার কাছে এমন ভাবে আর কে ভাত , জল চাইবে। পিতা গৌর মাইতি সন্তান হারিয়ে আজ বাকরুদ্ধ ও শয্যাশায়ী। দরিদ্র হলেও ছোট থেকে প্রতিবাদী সৎ ও ভদ্র ছেলে হিসেবে এলাকায় পরিচিত ছিল বিশ্বজিৎ মাইতি। প্রতিবেশী শিক্ষক পীযূষ কান্তি দাস জানান, ছেলেটি সবাইকে সম্মান করে চলতো। কাউকে কখনো তুইতোকারি করে কথা বলতো না ।ছোট থেকেই ও বড় শান্ত নম্র-ভদ্র ছিলো। বাড়িতে যখনই আসতো তখন সকলের সঙ্গে মিশে চলার চেষ্টা করতো। কখনো কারো সঙ্গে ওর খারাপ ব্যবহার করতে দেখিনি। বিপদে-আপদে সবসময় ও প্রতিবেশীদের পাশে এসে দাঁড়ানোর চেষ্টা করতো। আমরা এখন ওর ভীষণ অভাব বোধ করছি। এ প্রসঙ্গে সন্দেশখালির প্রাক্তন বিধায়ক নিরাপদ সরদার বলেন, এই সরকার ক্ষমতায় আসার পর সন্দেশখালির বিভিন্ন জায়গায় দুষ্কৃতীদের তান্ডব বেড়েছে। এলাকায় এই সমস্ত দুষ্কৃতকারীদের কাছে অসংখ্য আগ্নেয়াস্ত্র মজুদ রয়েছে। যখন তখন তারা সন্দেশখালি বিভিন্ন এলাকার সাধারণ মানুষের উপরে অত্যাচার করে। বেশ কিছুদিন আগে সন্দেশখালির ভাঙ্গি পাড়ায় খুন হয়েছে। শাসক দলের মদদপুষ্ট এসব লোকেরা নির্বাচনের সময় খুলনা শীতলিয়া ভান্ডার খালি সহ সন্দেশখালির বিভিন্ন জায়গায় সন্ত্রাস চালিয়েছে। এখনো তারা এই সন্ত্রাসের রাজনীতি বন্ধ করেনি। সন্দেশখালি থানার অধীন বউ-ঠাকুরান অঞ্চলের এই ঘটনা তা আবারো একবার প্রমাণ করলো। এ বিষয়ে খুলনা পঞ্চায়েতের প্রধান দিলীপ মল্লিক বলেন, কেদার বিধান আগে আমাদের টিএমসি পার্টি করলেও এখন তারা আর আমাদের দলে নেই। তাদের কুকর্মের জন্য দল অনেক আগেই তাদের বহিষ্কার করেছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

sixteen − five =