রবীন্দ্র সাহিত্যে প্রকৃতি প্রেম

0

~রবীন্দ্র সাহিত্যে প্রকৃতি প্রেম~

🔹লেখিকা- রীনা মন্ডল🔹

“বলাই”-গল্পে রবীন্দ্রনাথ বলাইয়ের মধ্য দিয়েই যে প্রকৃতি প্রীতির পরিচয় দিয়েছেন ,বিশ্ব সাহিত্যে তার তুলনা মেলা ভার ।”বলাই” চরিত্রটির মধ্যে রয়েছে গভীর এক তত্ত্ব কথা ।কোটি কোটি বছরের পুরোনো পৃথিবীও প্রকৃতির সঙ্গে বলাই একাকার হয়ে গেছে ।সৃষ্টির আদি লগ্নে বৃক্ষের জন্মোক্ষণে যেন বলাইয়ের জন্ম ।এই ছেলের আসল বয়স সেই কোটি বৎসর আগেরকার দিনে ।বিশ্ব প্রানের মাঝে বেঁচে থাকার আকুল আর্তি বলাই নিজের রক্তের মধ্যে শুনতে পায় ।আমি থাকব ,আমি বাঁচবো,আমি চির পথিক ,মৃত্যুর পর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে অন্তহীন প্রানের বিকাশ তীর্থে যাত্রা করবো রৌদ্রে ,বদলে,দিনে-রাতে। বিশ্ব প্রকৃতিকে রবীন্দ্রনাথ গভীরভাবে ভালোবাসতে পেরেছিলেন বলে,বলাই নামে একটি বালকের মধ্য দিয়ে এমন গভীর বৃক্ষ প্রেম আমরা দেখতে পেয়েছি ।রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আত্মজীবনী মূলক গ্রন্থ “জীবনস্মৃতি” থেকে সংকলিত “ঘর ও বাহির” রচনাটি ।বালক রবীন্দ্রনাথের গৃহবদ্ধ জীবন এবং মুক্ত প্রকৃতির হাতছানিই তুলে ধরা হয়েছে ।দোতলার একটি ঘরে তিনি আবদ্ধ থাকতেন এবং বিশ্ব প্রকৃতিকে তিনি আড়াল থেকে দেখতেন ।সকাল থেকে সন্ধ্যা অবধি চেয়ে থাকতেন নিচের ঘাট বাঁধানো পুকুর ও তার পাশের চেনা বটগাছটি দিকে ।প্রতিবেশীদের স্নানে যাওয়া আসার দৃশ্য দেখতেন ।নির্জন দুপুরে রাজহাঁস আর পাতিহাঁসদের জল-বিহার দেখতেন ।এরপর ঝুরিনামা বট গাছটির অন্ধকারময় ছায়াতল অবাক হয়ে দেখতেন ।প্রকৃতিকে এমন সুন্দর আস্বাদন করেও বৃদ্ধ বয়সে তিনি বলেছেন-“আজ সেই খড়ির গন্ডি মুছিয়া গেছে,কিন্তু গন্ডি তবু ঘোচে নাই।” বহির বিশ্ব বৃহৎ রহস্যময় ও বৈচিত্রময় বলেই মানুষ তার সীমিত জীবনকাল দিয়ে তাহা ভেদ করিতে পারেনা ।এ দৃঢ় বিশ্বাস তাঁর ছিল ।” দুই বিঘা জমি” কবিতায় স্নিগ্ধ-শিতল বনভূমির যে সৌন্দর্য তিনি তুলে ধরেছেন,তা এক কথায় অনবদ্য ।মাতৃভূমির বর্ণনায় ওপেন বলেছে–
“নমঃ নমঃ নমঃ সুন্দরী মম,জননী বঙ্গভূমি । গঙ্গারতীর স্নিগ্ধ সমীর,জীবন জুড়ালে তুমি ,
অবারিত মাঠ, গগন ললাট,চুমে তব পদধূলি।
ছায়া সুনিবিড়, শান্তির নীড়,ছোট ছোট গ্রামগুলি ।”
আমাদের এই পৃথিবী সৌন্দর্যে পরিপূর্ণ এক পৃথিবী ।এখানে যে আমরা মানব জন্ম লাভ করেছি,সেটা আমাদের পরম সৌভাগ্যের বিষয় ।স্নিগ্ধ শ্যামল বিশাল এই পৃথিবী এবং তার বিশাল মানব সমাজ বহু মানুষের প্রেম,সুখ,দুঃখ ও সংগীত দিয়ে রচিত বলে কবি মনে করেন ।তাই তার কাছ থেকে শুনতে পেলাম —–

“শ্যামলা বিপুলা এ ধরার পানে
চেয়ে দেখি আমি মুগ্ধ নয়নে ,
সমস্ত প্রাণে কেন যে কে জানে
ভরে আসে আঁখিজল–
বহু মানবের প্রেম দিয়ে ঢাকা
বহু দিবসের সুখে দুঃখে আঁকা
লক্ষ যুগের সংগীত মাখা
সুন্দর এ ধরাতল। ”

অরণ্যের সৌন্দর্যের মূল্যায়ন করলেন তিনি ।আদিম মানুষ অরণ্যেই বসবাস করতে শুরু করেছিল ।সেটাই ছিল ,আদিম মানুষের এক মাত্র আশ্রয়স্থল ।তাই কবি কণ্ঠে শুনতে পাই —-

“শ্যামল সুন্দর সৌম্য,হে অরণ্য ভূমি,
মানবের পুরাতন বাসগৃহ তুমি ।
নিশ্চল নির্জীব নহ সৌধের মতন–
তোমার মুখশ্রীখানি নিত্যিই নুতন
প্রাণে প্রেমে ভাবে অর্থে সজীব সবল ।”

প্রকৃতির স্নিগ্ধ রূপ যেমন কবির দৃষ্টি এড়িয়ে যায় নি ।তেমন প্রকৃতির ভয়াল ,ভয়ঙ্কর ,রূপকেও তিনি প্রত্যক্ষ করেছেন ।অবলীলা ক্রমে । ‘পত্রপুট’ কাব্যগ্রন্থের পৃথিবী নামক কবিতায় প্রকৃতির ভয়ঙ্কর রূপের যে বর্ণনা পাই —

“বৈশাখে দেখেছি বিদ্যুৎচঞ্চুবিদ্ধ দিগন্তকে ছিনিয়ে নিতে এলো কালো কোকিলের মতো ঝড়–
সমস্ত আকাশটা ডেকে উঠলো যেন কেশর ফোলা সিংহ হতাশ বনস্পতি ধুলায় পড়ল উবুর হয়ে,
হওয়ার মুখে ছুটলো ভাঙা কুঁড়ের চাল ।
শিকল-ছেড়া কয়েদি ডাকাতের মতো ।”

আর এখানেই রবীন্দ্রনাথের প্রকৃতি-প্রেমের সার্থকতা ।তিনি যেমন রোমান্টিক কবি ছিলেন ,তেমনি ছিলেন বাস্তববাদী কবি ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

7 − one =