মায়ের পরশ

0

লেখিকা -রীনা মণ্ডল

রাত প্রায় একটা ছুঁয়েছে, চাঁদের আলো ক্ষীণ হয়ে মেঘের আনাগোনা চলছে ।ঝিরিঝিরি বাতাস বইছে ।পূবের শ্মশান ঘাট থেকে শুধু আওয়াজ শোনা যাচ্ছে” হরি বোল, বল হরি ।”আর আজ কুকুর গুলিও খুব বেহায়া। হঠাৎ হঠাৎ চিৎকার জুড়ে দিচ্ছে ।এই সময় চয়নের গাড়ির শব্দ শোনা গেল ।গাড়ি বলতে একটা পুরানো বাইক, ওটাই বহু কষ্টে কিনেছে ।বাড়ির পাশের টার্নিং এর এখানে ঘোরাতে গিয়ে পরে গেল। মা শব্দ শুনতে পেল ।বিড়বিড় করে মা বলা শুরু করলো”, এ অমানুষ হয়ে গেল ।আমার হয়েছে যত জ্বালা !আজ হয়ত আবার গলায় ঢেলে এসেছে।”
চয়ন গাড়িটা তুলে আবার স্টার্ট দিয়ে বাড়ি আসলো ।চয়ন ভাবলো মা ঘুমিয়ে আছে ,তাই গাড়িটা তুলে ঘরে রাখা ঢাকা খাবার খেতে বসলো ।
ভাত নিয়ে বসছে, হঠাৎ মার আগমন ।
“কিরে তুই আজও খেয়ে আসলি? আমি স্পর্ষ্ট শব্দ শুনতে পেলাম , দেখলি তো কেউ তোর কথা ভাবে? আর আমি তো মা.. আমি পারিনা ,আমি পারিনারে -আর এভাবে থাকতে ?ভগবানও এমন আমায় নেয়ও না !”
চয়ন চুপ হয়ে শুনছিলো ।মার মুখোমুখি কথা বলতে ভয় হচ্ছিল। আজ একটু বেশিই খাওয়া হয়েছিল তার ।
“ঠিক আছে খেয়ে শুয়ে পর … আমি মরলে বুঝবি ?”
চয়ন আর খেতে পারলো না ।একটু বমি বমি আসছে ।আবার বমি করলে মা আরও সন্দেহ করবে তাই পকেটে রাখা গুটকা টা খেয়ে বাথরুম গিয়ে সিগারেট টা ধরানোর চেষ্টা করলো ।কিন্তু নেশা এত টাই ছিল যে ধরাতে পারছিলো না ।বহু চেষ্টার পরে সিগারেট টা ধরিয়ে ভাবতে লাগলো আর বিড়বিড় করে বলতে লাগলো ,”মা ,মা’গো আমি কি আর সাধে খাই? আমি যে আর পারিনা ঠিক থাকতে -?
মা তখনও ঘুমায়নি।
” কিরে চয়ন !যা বাবা এখন শুয়ে পর আর কত? আর পারিনা ।”
মার উপস্থিতি টের পেয়ে সিগারেট টা জলে চুবিয়ে দেয় ।
হ্যা মা…
রাত প্রায় দু ‘টা তবুও ঘুম আসছিলো না, শুধু
শ্মশানের কাছ থেকে আসা” হরিবোল বল হরি “কানে বিঁধছিলো। তখনি চয়ন হারিয়ে গেল অতীতে।
হ্যা তারও ঘর ছিল, সংসার ছিল, ফুলের মতো ফুটফুটে একটা ভালোবাসার বাগান ছিল ।সেই বাগানের সব থেকে সুন্দর ফুল ছিল গোলাপী ।সেখানে কত সুন্দর খেলা হতো ,হাসি হতো ,অভিনয় হতো আর ভালোবাসাও ছিল ।হঠাৎ একদিন ঝড় আসলো ।বাগান তছনছ হয়ে গেল ।গোলাপী গোলাপ মাটিতে লুটিয়ে পড়লো। চয়ন আর্তনাদ করলো –কে শোনে তার কথা ?এর পরদিন চয়ন ঠিক বুজতে পেরেছিলো গোলাপ তো কীট ময় !সেই কীট তাকে ধ্বংস করে দিল ।
গোলাপী মারা যায় ,সুইসাইড করলো ।আর পুরো দোষ পড়লো চয়নদের উপরে। চয়নকে পুলিশ ধরে নিয়ে যায় অথচ যে গোলাপী তার প্রাণ তার ভালোবাসা সেই কিনা আগুনে জ্বলসে যাচ্ছে পারছিলো তার অন্তিম সময়ে উপস্থিত থাকতে ।

সকালে মা আগেই উঠে সিদ্ধ ভাত রাঁধতে শুরু করলো। মা জানে ছেলের সারাদিন খাওয়া হয়নি ।,আর মা এটাও জানে চয়ন তো ওরকম নয় ও তো পাড়ার সব থেকে ভালো ছেলে ।কাউকে দোষ দিয়েও লাভ নেই ?সব ওর কপাল! নাহলে প্রাইমারী চাকরিটা হয়েও হলো না !ভাইভাতে আউট! এর থেকে দুঃখ কি আর আছে ?
মা ভাত রেঁধে চয়ন কে ডাকতে লাগলো ।
“চয়ন। কি’রে চয়ন ?–ওঠ বাবা। তোর ডিউটি আছেনা?–কিরে ওঠ !”
হ্যা মা…
চয়ন নিজেকে ঠিক করে ভাবতে একটু সময় লাগলো ।ভুলেই গেল রাতে কি হয়েছিল ?একটু মনে হওয়ায় নিজের প্রতি লজ্জা হলো ।ইস! মা কি ভাববে?
চয়ন উঠে ব্রাশ করে স্নানটা সেরে নিল। ঘড়িতে তখন আট টা, সাড়ে আট টায় তার ডিউটি ।আর আধ ঘন্টা সময়। বলা বাহুল্য চয়ন একটা কোম্পানির সুপারভাইজার ।
“এই ভাত বাড়া আছে খেয়ে নে–”
ভাত খাওয়া শেষ হওয়ার পথে মা চয়ন কে বললো ,
“কিরে বাবা, এভাবে আর চলে? এখন নতুন করে ভাব ;লোকে জানলে কি হবে? আর তোর দাদারাও নানান কথা বলছে। এখন একটা সংসার কর। আমি মেয়ে দেখি ।অন্তত আমায় একটু রেহাই দে ।আর আমার পেটের ব্যথাটা ক’দিন থেকে খুব বেড়েছে ।কখন কি যে হয় !”
মা –মা !ওসব বলো না ,তুমি না থাকলে আমি.. তুমি তো জানোই দাদারা দাদাদের মতো কাজে ব্যস্ত ।

চয়ন যেতে যেতে তাই ভাবছিলো কি করবে ?না মার কথাই শুনবে —
আজ কাজেও মন বসছিলো না ।খুব উদাসীন লাগছিল তাকে। দুপুরে লাঞ্চ এর খাওয়া শেষ করে মনে পড়লো মার তো পেটের ব্যথা ,তাই বাজারের MD ক্লিনিক থেকে কয়েকটা গ্যাসের ট্যাবলেট নিল ।সামনে মাসে বেতন পেয়ে মার জন্য একটা ভালো ডাক্তার দেখাবে আর মাকে বলেই দিবে,” মা আর তোমার কষ্ট করতে হবেনা ,আমি নতুন জীবন শুরু করব ।”
এসব ভেবে কিছুটা হাসি আসলেও মনের ভিতরের চাপা কান্না দাও দাও করে জ্বলছিল ।অন্তর থেকে কেউ যেন বলে উঠছিলো আমায় ক্ষমা করে দিও ,শুধু মার জন্যই… প্লিজ আমি শুধু তোমাকেই—
ডিউটি শেষ হওয়ার পরে আজ আর চয়ন কিছু খেলো না, মাকে আজ বলেই দিবে সব কথা,নতুন জীবন কথা–
তাই একটু আগেই বাড়ি আসার চেষ্টা করলো ।কোম্পানি থেকে গাড়িতে কুড়ি মিনিট পথ।কিছুদূর আসার পরে ফোন টা বেজে উঠলো ।প্ৰথম বার তুললো না ।আরও বাজছিলো ,গাড়িটা থামিয়ে ফোনের স্ক্রিনে লেখা বৌদির নাম্বারে ফোন !কি ব্যাপার যে বৌদির সাথে দু বছর থেকে কথা বন্ধ তার ফোন? ভাবলো নতুন কোন মতলব নাকি? তবে পরক্ষনেই মনে হলো ফোনটা ধরা যাক ।
ওই পাশে দাদার গলা ।
“চয়ন !চয়ন! চয়ন !তুই তাড়াতাড়ি আয়। মা খুব সিরিয়াস ।”
চয়ন ফোনটা কেটে খুব স্পিডে গাড়িটা ছাড়লো ,না মা তোমার কিছু হবেনা আমি আছি তো–
কি ব্যাপার এত লোক !

“চয়ন বাবা এসেছিস।”
মা তোমার কিচ্ছু হবেনা ।বলো কি হয়েছে? আমি ডাক্তার ডাকছি। ওই ছোটদা ,ছোটদা!গাড়িকে ফোন কর। অ্যাম্বুলেন্স ডাক না!
” বাবা ওসব করিস না ।আমি হয়ত আর বাঁচবো না। তুই মানুষ হ ।আর বল আর সংসার করবি ।”
মা আমি সব রাজি ।
গাড়িও আসলো তখন।
“চয়ন আমায় একটু জল দিবি ?”
বৌদি !বৌদি !একটু জল আনো —
বৌদির হাতের গ্লাসটা সজোরে নিয়ে মার মুখে জল দিল ।
“আমি তৃপ্তি ,শান্তি পেলাম ।অয়ন চয়নকে দেখিসরে –আর আমায় তোর বাবার পাশেই রাখিস ,নিজের ভূমিতে তৃপ্তি….. পা…বো…. ”

মা- মা- মা –মা…
আকাশ গুমরে উঠলো বাতাস আর্তনাদ করে উঠলো বৃষ্টি ঝমঝমিয়ে পড়তে লাগলো ।মা চির ঘুমে–

রাত দু ‘টার দিকে চয়ন শুধুই শুনছিলো সবাই জোরে জোরে বলছিলো ,”, বল হরি —হরি বোল

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

thirteen + one =