অলোক আচার্য, নিউ বারাকপুরঃ- কৈলাস থেকে উমা এল বাপের বাড়িতে। একথা শুনতে শুনতে আমাদের বড় হওয়া। কিন্ত দুর্গাপূজায় উমারূপী মাতৃপ্রতিমা দর্শনে মণ্ডপে মণ্ডপে আমরা সবাই ভিড় করি। কিন্তু সেই উমার গায়ে মানস সরােবরের মাটি? একথা ভাবলেই আনন্দের পুলকিত হয় দেহমন। আরম্ভর এবং জৌলুসপূর্ণ পূজার ভিড়ে শুদ্ধতা, সাত্ত্বিকতা মেনে পূজার কথা আজ বলবাে আপনাদের। কলকাতা বিমানবন্দরের পাশে নিউ ব্যারাকপুরের বিশ্ব সেবাশ্রম সঙ্ঘের দূর্গাপূজায় মাতৃ প্রতিমার শ্রীঅঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হয় কৈলাস ও মানস সরােবরের মাটি। এমন অনেক দুঃপ্রাপ্য বিরল উপাচার ব্যবহৃয় এখানকার পূজা যা জানলে আপনি এই পূজা দর্শনের সুযােগ হাতছাড়া করতে চাইবেন না।

বিশ্ব সেবাশ্রম সঙ্ঘ-র দুর্গাপূজা শ্রদ্ধালুদের এই বার্তা দেয় যে—শুদ্ধতা ও সাত্ত্বিকতার সঙ্গে শাস্ত্রীয় নিয়মে কীভাবে মায়ের পূজা করা উচিত। বিশ্ব সেবাশ্রম সঙ্ঘ-র প্রতিষ্ঠাতা শ্রীসমীরেশ্বর ব্রহ্মচারী জানালেন তাঁরা এই উদ্দেশ্য নিয়েই পূজা করেন যেখানে শাস্ত্রীয় উপকরণ এবং মায়ের প্রতি ভক্তি ও শ্রদ্ধা নিবেদনে যেন কোনও খামতি না থাকে। পূজার প্রস্তুতি থাকে এখানে বছরভর। দুর্গাপূজায় প্রয়ােজনীয় সমস্ত বিরল দুঃপ্রাপ্য উপকরণ নিবেদিত হয় মায়ের উদ্দেশ্যে।

পূজায় লাগে গঙ্গা, যমুনা, গােদাবরী, সরস্বতী, নর্দমা, সিন্ধু, কাবেরী—এই সপ্ত-নদনদীর জল। মায়ের মহাস্নানে দরকার হয় হয় ১৫ প্রকার মাটি। যেমন——দেবদ্বার মৃত্তিকা (দেবতা-মন্দিরের মাটি), অশ্বদন্ত মৃত্তিকা (ঘােড়া যে ঘাস খাবে সেখানের মাটি), গজদন্ত মৃত্তিকা (হাতির দাঁতের মাটি), বাহ দন্ত মৃত্তিকা (শূকরের দাঁতের মাটি), বল্মিক মৃত্তিকা (উই পোকার বাসার মাটি), রাস্তার চারমাথার মাটি, বৃষ শিং মৃত্তিকা (ষাঁড়ের শিংয়ের মাথার মাটি), রাজদ্বার মৃত্তিকা (রাজবাড়ির মাটি),নদীর উভয় কুলের মৃত্তিকা, কুশমূলের মৃত্তিকা, সরােবর মৃত্তিকা, গঙ্গা মৃত্তিকা, বেশ্যাদ্বার মৃত্তিকা, পর্বত শিখরের মৃত্তিকা, যশালার মৃত্তিকা। শুধু তাই নয় পূজায় মহাস্নানের জন্য প্রয়ােজন বিভিন্ন প্রকার জলও। যেমন—আকাশগঙ্গা মন্দাকিনী নদীর জল, সরস্বতী নদীর জল, সহস্রধারার জল, চন্দন জল, শিশিরের জল, বৃষ্টির জল, মিষ্টি জল, পুকুরের জল। অষ্টকলসীর স্নানের জলে লাগে সাত সমুদ্রের জল, আকাশগঙ্গা মন্দাকিনীর, ঝরনার জল, সােনার জল, রূপার জল, পদ্মরেণুর জল, চন্দনবাসিত নদীর জল, সর্বতীর্থের জল।

শ্রীসমীরেশ্বর ব্রহ্মচারী জানালেন, আশ্রমের সংগ্রহশালায় প্রতিটি জল ও মাটিই সংগ্রহে আছে এবং মায়ের পূজার তা ব্যবহৃত হয়। সরস্বতী নদীততা অবলুপ্ত? এই প্রশ্নের উত্তরে তিনি জানালেন – বদ্রীনাথধামের মানাগ্রামে সরস্বতীর নদীর ধারা কিছুটা প্রবাহমান। আবার কুরুক্ষেত্রে আর্যযুগে সরস্বতী নদী বইত। এখনও সেখানে নদীর খাত আছে। এই দুই স্থান থেকেই সরস্বতীর জল আনা হয়। সিন্ধুর জল আনা হয় লেহ-লাদাখ থেকে। আরও এই উল্লেখ্যযােগ্য বিষয় জানা গেল যে শিবভূমি কৈলাসে গৌরীকুণ্ড নামে একটি কুণ্ড আছে যেখানে দেবী প্রতিদিন স্নান করেন বলে ভক্তজনের বিশ্বাস। ওই পবিত্র গৌরীকুণ্ডের জলও এখানকার পূজায় মায়ের স্নানে ব্যবহৃত হয়। অর্থাৎ দেবী পুজা গ্রহণের জন্য এত দূর এসেও তার রােজকার স্নানের জলই এখানে পেয়ে থাকেন। আর মায়ের শ্রীঅঙ্গে মানস সরােবর, কৈলাসের মাটির মেশানাের পবিত্র কর্ম নিজের হাতে সম্পাদন করেন শ্রীসমীরেশ্বর।

তিনি নিজেও একজন অসামান্য মৃৎশিল্পী এবং ভাস্কর। প্রতি বছরে অষ্টমী দিন কুমারী পূজা এখানকার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। পূজার দিনগুলিতে রােজ মাকে তিনপ্রকার মাছের ভােগ নিবেদন করা হয়। সঙ্গে খিচুরী, পঞ্চ ব্যাঞ্জন, পঞ্চভাজা, পায়েস, চাটনি, নাড়, মুরকি, আশ্রমের গাছের আম-কাঠাল সহ নানাপ্রকার ফল। রাতে লুচি, সুজি, আলুরদম, তরকারি, মিষ্টি ভােগ নিবেদন করা হয়। মায়ের শয়নের জন্য খাট-বিছানা পেতে নিদ্রাকুম্ভ দেওয়া হয়। সকালে দাঁত মাজার জন্য দন্ত কাঠি নিবেদন করা হয়। এমন যেখানে আয়ােজন সেখানে মৃন্ময়ী মূর্তিতে মা চিন্ময়ী রূপে বিরাজনা করে পারেন?

শুধুই কি পূজা? না আত্মা মুক্তি ও মােক্ষের সাথে সাথে আর্ত মানবের সেই বিশ্ব সেবাশ্রম সঙ্ঘের ব্রত। শ্রীসমীরেশ্বর ব্রহ্মচারী জানালেন বিগত বছরের মত এবছরও ৫০০০ পথশিশু, গরীব মানুষকে নতুন বস্ত্র উপহার দেওয়া হবে। করােনার প্রথম ঢেউয়ের লকডাউনে যেমন সেবা হয়েছে তেমন দ্বিতীয় ঢেউয়ের লকডাউনেও টানা ৫৫ দিন খাদ্যসামগ্রী, মাস্ক, স্যানিটাইজার বিতরণ করা হয়েছে। অক্সিজেন সংকটে বিভিন্ন ক্লাব-সংগঠনকে সাথে নিয়ে অক্সিজেন পরিষেবা প্রদান, ইয়াস ঘূর্ণিঝড়ে ৫২টি গ্রামে ত্রাণকার্য এবং রাজ্যজুড়ে এক লক্ষ মাস্ক বিতরণ—বছর ভর মানুষের সেবার সঙ্গে দেবসেবায় নিয়ােজিত বিশ্ব সেবাশ্রম সঙ্ঘ।