নেতাজি ইন্ডোর স্টেডিয়ামে এনআরসির সুরে কট্টর হিন্দুত্ববাদের বাণী গাইলেন অমিত শাহ

0

অগ্নিভ ভৌমিক, কলকাতা :- বেকায়দায় পড়লে ধর্মীয় রাজনীতি যে দারুন ভাবে কাজে আসে তা আজকে নেতাজি ইন্ডোর স্টেডিয়ামে অমিত সাহের সভা থেকে দারুণ ভাবে বোঝা গেল। তেমনি তাঁর কথায় এও বোঝা গেল যে দেশে নাকি বিজেপি থাকলেই, হিন্দু ধর্ম সুরক্ষিত থাকবে। কিন্তু হিন্দু ধর্মের অসুরক্ষার কারণটা এখনও ধোঁয়াশা। কট্টর হিন্দুত্ববাদের বীজ যে পশ্চিমবাংলায় ধীরে ধীরে পোঁতা হচ্ছে তা নিয়ে কোন সংশয় নেই। আর সেই বীজে জল ঢালতেই আজকের সভায় উপস্থিত ছিলেন বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি তথা দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, অমিত সাহ। কারণ আজকের সভায় তার একমাত্র বার্তা ছিল – বিজেপির ভোট বাড়লেই হিন্দুদের স্বার্থ সুরক্ষিত হয়। তিনি বলেন, ‘‘বিজেপির ১৮টা আসন পাওয়ার পরিণাম দেখুন। আগে দুর্গাপুজোর বিসর্জনের জন্য আদালতে যেতে হচ্ছিল। এ বার আর কারও হিম্মত হচ্ছে না বাধা দেওয়ার। বসন্ত পঞ্চমী দেখুন, কারও হিম্মত হচ্ছে না সরস্বতী পুজোয় বাধা দেওয়ার। কারও হিম্মত নেই রামনবমীতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করার।’’
এর আগে কোনো বিজেপি নেতাকে বাংলায় এসে এইভাবে উগ্র হিন্দুত্ববাদের কন্ঠস্বরে কথা বলতে শোনা যায়নি। তবে লোকসভা নির্বাচনের আগে এসে তিনি এই প্রসঙ্গেই কথা বলেছিলেন। তবে এবার আরও জোর গলায়। স্পষ্ট ভাবে।
প্রসঙ্গত আজ কলকাতার নেতাজি ইন্ডোর স্টেডিয়ামে বিজেপির পক্ষ থেকে এক বিশাল সভার আয়োজন করা হয়। সেখানে একদিকে যেমন উপস্থিত ছিলেন মুকুল রায়, দীলিপ ঘোষ ও রাহুল সিনহা সহ উচ্চস্তরের বিজেপি নেতা, তেমনি অন্যদিকে গেরুয়া শিবিরের পতাকা হাতে তুলে নিতে উপস্থিত ছিলেন বিধাননগরের প্রাক্তন মেয়র তথা তৃণমূল বিধায়ক সব্যসাচী দত্ত। সোমাবারই তিনি বলেন, ‘‘দেবীপক্ষ চলছে। ভাল সময়। নেতাজি ইন্ডোরে গিয়ে অমিত শাহের হাত থেকেই বিজেপির পতাকা তুলে নেব।’’ কথার খেলাপ হয়নি। আজকে সময় মতোই আমিত শাহের হাত থেকেই গেরুয়া পতাকা তুলে নেন তিনি।
বলাবাহুল্য লোকাসভা নির্বাচনের চার মাস পর অমিত সাহ কলকাতায় আসেন, জাতীয় নাগরিক পঞ্জি (এনআরসি) ও নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল (সিএবি) নিয়ে কথা বলতে।
তার বক্তৃতার বেশিরভাগটাই জুড়ে ছিল জাতীয় নাগরিক পঞ্জি (এনআরসি) প্রসঙ্গ। বাংলার জনতাকে ‘সম্পূর্ণ সত্যি’ কথা বলতে এসেছেন বলে তিনি দাবি করেন। অমিত শাহ বলেন, ‘‘মমতাজি বলছেন, এনআরসি হলে লক্ষ লক্ষ হিন্দু শরণার্থীকে বাংলা ছেড়ে যেতে হবে। এর চেয়ে বড় কোনও মিথ্যা হয় না।’’ বিজেপি সভাপতির কথায়, ‘‘আমি সবার সামনে আশ্বস্ত করছি, সব শরণার্থীকে আশ্বস্ত করছি, যাঁরা এ দেশে চলে এসেছেন, তাঁদের কাউকে ভারত ছাড়তে বাধ্য করা হবে না।’’
তেমনি ভারতে যত হিন্দু, শিখ, বৌদ্ধ, জৈন, খ্রিস্টান এসেছেন, তাঁদের সবাইকে নাগরিকত্ব দিয়ে দেওয়া হবে বলে তিনি জানান। প্রতিবেশী দেশগুলি থেকে ভারতে চলে আসা হিন্দু, শিখ, বৌদ্ধ, জৈন, খ্রিস্টানদের নাগরিকত্ব দিতে ওই বিল সংসদে পেশ করা হয়েছিল প্রথম মোদী সরকারের আমলেই— মনে করিয়ে দেন দ্বিতীয় মোদী সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
প্রসঙ্গত প্রতিবেশী রাজ্য অসমে এনআরসির চূড়ান্ত তালিকা বের হলে দেখা যায়, বাদ পড়ে যাওয়া ১৯ লক্ষ বাসিন্দাদের বেশিরভাগই হিন্দু বাঙালি। আর সেই এনআরসির হাওয়া বাংলায় ঢুকতেই, চিন্তায় পড়ে যায় বঙ্গবাসী বাঙালি। এনআরসি ঘিরে তৈরী হয় সংশয়, বিভ্রন্তি।
তাই সারা বাংলা আজ তাকিয়ে ছিল অমিত শাহের দিকে। পশ্চিমবাংলায় এনআরসি নিয়ে তৃণমূল সহ বামফ্রন্ট ও কংগ্রেস বিরোধিতায় সরব হয়েছে। তাই বিগত বেশ কয়েকদিন ধরেই দলের রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষ একাধিক বার মুখ খুলেছিলেন। এ দেশে যে হিন্দুরা রয়েছেন বা এসেছেন, তাঁদের আতঙ্কিত হওয়ার কোনও কারণ নেই।
এদিন অমিত শাহ সকলকে আশ্বস্ত করে বলেন, “‘‘আমি সবার সামনে আশ্বস্ত করছি, সব শরণার্থীকে আশ্বস্ত করছি, যাঁরা এ দেশে চলে এসেছেন, তাঁদের কাউকে ভারত ছাড়তে বাধ্য করা হবে না।’’
তেমনি অন্যদিকে ‘অনুপ্রবেশকারী’ তত্ত্বে অটল থেকেই অমিত শাহ বলেন, ‘‘একটাও অনুপ্রবেশকারীকে ভারতের মাটিতে আমরা থাকতে দেব না। এক জনকেও থাকতে দেব না।’’ দেশের সুরক্ষার জন্যই অনুপ্রবেশকারীদের তাড়ানো দরকার বলে তিনি এ দিন মন্তব্য করেছেন।
তেমনি ছাড়েননি মমতাকেও একহাত নিতে। রীতিমত মমতাকে নিশানা করে তিনি বলেন, “‘মমতাজি বলছেন, এনআরসি হলে লক্ষ লক্ষ হিন্দু শরণার্থীকে বাংলা ছেড়ে যেতে হবে। এর চেয়ে বড় কোনও মিথ্যা হয় না।’’ নেতাজি ইন্ডোর স্টেডিয়াম থেকে এ দিন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতি সতর্কবার্তাও উচ্চারণ করে গিয়েছেন অমিত শাহ। বাংলাদেশ, পাকিস্তান বা আফগানিস্তান থেকে যাঁরা ভারতে চলে আসতে বাধ্য হয়েছেন, তাঁদের ‘প্ররোচিত’ করার রাজনীতি থেকে দূরে থাকার পরামর্শ দিয়েছেন। মমতার উদ্দেশে শাহের বার্তা, ‘‘যাঁরা নিজেদের ভূমিতে ফিরেছেন, সন্ত্রাসের শিকার হয়ে এসেছেন, তাঁদের নিয়ে মজা করবেন না, দীর্ঘশ্বাস লাগবে।’’

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

7 + nineteen =